‘দ্য মিরাকল অফ ডানকার্ক’ বলে খ্যাত অপারেশন ডায়নামো এর রুদ্ধশ্বাস কাহিনী পড়ার আগে ৪টি লাইন পড়ুন:
“400,000 Men couldn’t get home,
So home came for them”

“Only a miracle can save 400,000 soldier life”

“Hope is Weapon,Survival is victory”

“আমি ৩টি সন্তান ও ৯টি মুভি #জন্ম দিয়েছি”
—-ক্রিস্টোফার নোলান ❤

এসব কথার অর্থ কি সেটা পড়ে বলবো।এই পোস্ট পড়ে সেটা ভালোভাবে বুঝার জন্য আগে আপনাকে চোখ বন্ধ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি ঘটনার ভুক্তভোগী সৈনিক হিসেবে নিজেকে কল্পনা করতে হবে।ভাবুন তো একবার যে আপনি সহ চার লাখ সৈনিক যুদ্ধে মার খেতে খেতে ও ক্রমাগত পিছিয়ে যেতে যেতে এমন এক জায়গায় উপস্থিত হয়েছেন যেখানে তিনদিকে শত্রু নিয়ন্ত্রিত ভূমি আরেকদিকে বিশাল সাগর!
খাবার নেই,
রসদ নেই,
পালানোর জায়গা নেই,
যুদ্ধ করার মত মনোবল নেই,
গোলাবারুদ ও ফুরিয়ে আসছে,
মুহুর্মুহু আর্টিলারি ও বিমান হামলা চালাচ্ছে জার্মানরা।জীবন ও মৃত্যুর মাঝে শত শত সৈনিকের সাথে উদ্ধার পাবার আশায় ডানকার্ক বিচে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে আপনি।ব্যাপারটা কেমন ভয় এবং আতঙ্কের একবার কল্পনা করুন।

ডানকির্ক বিচে বন্দুকের গুলিতে জার্মান বিমান শুট করার ব্যর্থ চেষ্টারত সৈনিক!

#প্রেক্ষাপট:
হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি জার্মানি ১৯৩৯ এর সেপ্টেম্বরে পোল্যান্ড আক্রমণ করে।জার্মানরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেই তারা আস্তে আস্তে তাদের পাশেরদেশ বেলজিয়াম, পোল্যান্ড
,ডেনমার্ক, নরওয়ে দখল করে ফেলে। ধীরে ধীরে তারা ফ্রান্সের দিকে আসা শুরু করে।ফলে ব্রিটিশ ও ফ্রান্স সরকার জার্মানির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ এবং যুদ্ধ ঘোষণা করে।ব্রিটিশ সরকার British Expeditionary Force (BEF) পাঠায় ফ্রান্সে জার্মানিকে মোকাবিলা করার জন্য। যার প্রধান ছিলেন Lord Gort।এই যুদ্ধে এক পক্ষে ছিল ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, পোল্যান্ড, বেলজিয়াম। অপরপক্ষে ছিল জার্মান বাহিনী।শুরু হয়েছিল ২৬ মে ১৯৪০ আর শেষ হয়েছিল ৪ জুন ১৯৪০ সালে।

হয়তো অনেকে ভাবছেন আমেরিকা কোথায়? ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপান দ্বারা পার্ল হার্বার আক্রমণের পরই ফাইনালি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়ে শক্তিশালী মিত্রবাহিনী গড়ে তোলে আমেরিকা।যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যোগ দেয়ার আগ পর্যন্ত মিত্রবাহিনীর অনেক দুর্বল ছিল।

এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয় ইংল্যান্ডের Lord Gort, ফ্রান্সের Maxim Weygand, George Blanched, J.m Abrial-সহ অনেকে ঊর্ধ্বতন সেনারা। নাৎসি বাহিনী থেকে নেতৃত্ব দেয় Ged Von Rundstedt, Ewald Von Kleist- এর মত কুখ্যাত নাৎসি সেনারা।

কিন্তু দুর্বার জার্মান আক্রমনের সামনে টিকতে পারেনি বিশাল মিত্রবাহিনী।তারা পিছু হটতে শুরু করে।সেসময় ব্রিটিশ, ফরাসি আর বেলজিয়ান সৈন্য মিলে প্রায় চার লক্ষ সৈন্য ফ্রান্সের ডানকার্ক উপকূলে আশ্রয় নেয়। ডানকার্কের ভৌগোলিক অবস্থান এমন ছিলো যে এর তিনদিকে স্থল আর একদিকে জল। জলসীমা পার হলেই ওপাশে ব্রিটেন। ২১শে মে ১৯৪০ সালে হিটলারের বাহিনী তিনদিক থেকে মিত্রবাহিনীকে ঘিরে ধরলো। শুরু হলো অবরোধ। এই সংকট মুহূর্তে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল লঞ্চ করলেন এক নতুন মিশনের।নাম দেয়া হলো অপারেশন ডায়নামো। ব্রিটিশ আর্মি, নেভি এবং এয়ারফোর্সকে দায়িত্ব দিলেন ডানকার্কে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা প্রায় চার লক্ষাধিক সৈন্যকে উদ্ধার করার। চার্চিল এই ঘটনাকে অভিহিত করেন, “a colossal military disaster” বলে।ডানকার্ক মুভির ট্রেইলারের শুরুতে এই বাক্যটি আপনারা শুনতে পাবেন।
এদিকে সময় যত গড়াচ্ছিলো ডানকার্কে অবরুদ্ধ থাকা সৈন্যদের জীবন সংশয় তত বাড়ছিলো। জার্মান বাহিনী চাইলেই তখন যেকোন সময় অবরুদ্ধ অবস্থা ভেঙে মিত্রশক্তির উপর আক্রমণ করে তাদেরকে তছনছ করে দিতে পারতো!!

উদ্ধারের অপেক্ষায় থাকা সৈনিকদের লাইন

#ক্ষয়ক্ষতি:
আগেই বলেছি যে মিত্রবাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ। এর মধ্যে আহত,নিহত এবং আটক হয়েছিল প্রায় ৬৮,১১১ জন।৬৩৮৭৯ ট্যাংক,মোটরসাইকেল এবং বিভিন্ন যানবাহন ধ্বংস হয়েছিল।২৪৮২ ফিল্ড আর্টিলারি, ৬টি ডেস্ট্রয়ার, ২০০ মেরিন ভেসেল এবং প্রায় ১০০ এয়ারক্রাফট ধ্বংস হয়েছিল।
ফ্রান্সের সৈন্যের মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও ৪৮,০০০ সৈন্য ধরা পড়ে।
অপরপক্ষে ৮ লাখ নাৎসি সেনার মধ্যে ২০ হাজার নিহত এবং আহত হয়। নাৎসিবাহিনীর প্রায় ১০০ ট্যাংক, ১৪৬ এয়ারক্রাফট ধ্বংস হয়।এই যুদ্ধে প্রায় ১ হাজার বেসামরিক লোক মারা যায় !
খেয়াল করে দেখুন দুই পক্ষের হতাহতের তুলনায় সিভিলিয়ান কত কম!!

যেহেতু ডানকির্ক যুদ্ধটা ছিল মিত্রবাহিনীর জন্য জাস্ট ডিফেন্ড করে এই সৈকত ত্যাগ করা,সেক্ষেত্রে তারা ছিল সফল। ৩,৩৮,২২৬ জন উদ্ধার সহ প্রায় ১৩৯,৯৯৭ ফ্রেন্স, পোলিশ, বেলজীয় উদ্ধার করা হয়। যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সবচেয়ে বড় উদ্ধারের ঘটনা।

জাহাজগুলোর ইভাকুয়েশন রুট

#হিটলারের ভুল নাকি সৈনিকদের সৌভাগ্য:
অনেকেই বলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের পরাজিত হওয়ার মূল কারণ হলো শীতের সময় রাশিয়া আক্রমণ করার ভুল সিদ্ধান্ত। তবে ডানকার্কে মিত্রবাহিনীর অবরুদ্ধ অবস্থাতেও হিটলারের অদ্ভুত সিদ্ধান্তও জার্মানির হেরে যাওয়ার অনেক বড় এক কারণ!!
মিত্রবাহিনীকে একদম কোনঠাসা করে ফেললেও হিটলার তার দুর্ধর্ষ জার্মান বাহিনীকে ‘হল্ট অর্ডার’ দিলেন।যদিও অনেক ইতিহাসবিদ বারবার এই ‘হল্ট অর্ডার’-কে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।কিন্তু শত্রুকে একদম বাগে পেয়েও কেন দয়া দেখালেন নাকি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা কখনই জানা যাবে না।

হল্ট অর্ডার মানে হলো জার্মানরা যখন প্রায় মিত্রবাহিনীকে ব্যাটল অফ ডানকার্কে একদমই নাস্তানাবুদ করে ফেলে তখন হিটলারের ইচ্ছাতেই ২৪ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত নাৎসি বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে না গিয়ে তিনদিন তারা যুদ্ধ বন্ধ রাখে যা মিত্রবাহিনীকে প্রচুর সময় দেয়। অবরুদ্ধ অবস্থার ফায়দা নিয়ে মিত্রবাহিনী ডানকার্ক ত্যাগের জন্য প্রস্তুতি শুরু করতে থাকে।

বর্তমানে ডানকির্ক বিচের এই সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় আছে?

#উদ্ধার অভিযান:
মে মাসের ২৬ তারিখ থেকে শুরু হয় অপারেশন ডায়নামো।যদিও প্রথমদিকে এই অপারেশনের কথা ফ্রান্সও জানতো না!! ডানকার্কে জলসীমায় ভিড়তে শুরু করে ব্রিটিশ নেভির জাহাজ, সিভিল জাহাজ, ছোটখাট বোট।ব্রিটিশ নেভির সাথে ব্রিটেনের সিভিল সমাজও স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে ডানকার্কের আটকে পড়া সৈন্যদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।শত শত ফিশিং বোট,ছোট ছোট বাণিজ্যিক জাহাজ,যাত্রীবাহী ছোট জাহাজ, ব্যক্তিগত জলযান নিয়ে সাধারণ মানুষ বেড়িয়ে পরে নিজেদের সৈনিকদের উদ্ধার করার জন্য।এটি ছিল ইতিহাসে অকল্পনীয় একটি ঘটনা।এই ঘটনাকেই বলা হয়েছে এভাবে যে
“400,000 Men couldn’t get home,
So home came for them”

জাহাজভর্তি সোলজার!

এভাবে ৪ই জুনের মধ্যে প্রায় ৩ লক্ষ ৩৮ হাজার সৈন্যকে নিরাপদে ডানকার্ক থেকে সরিয়ে নেয়া হয়।সৈন্য ত্যাগের খবর পেয়ে জার্মান বাহিনীও শুরু করে মারাত্মক আক্রমণ।একদম কোণঠাসা হয়ে যাওয়ায়
সেই আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে নাৎসি বাহিনীর সাথে ‘ব্যাটল অফ ডানকার্ক’ এ নিহত হয় মিত্রশক্তির ৬৮ হাজার সৈন্য! যুদ্ধ হয় জলে, স্থলে আর আকাশে। ব্রিটিশ এয়ারফোর্সও ডানকার্কের ইভ্যাকুয়েশনের সময় ডিফেন্স লাইন হিসেবে কাজ করে।ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের ট্যাংক এবং অন্যান্য ভারী অস্ত্র-শস্ত্র রেখেই ডানকার্ক ত্যাগ করে। ৪ই জুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অপারেশন ডায়নামোর সমাপ্তি ঘোষণা করে বলেন, “We must be very careful not to assign to this deliverance the attributes of a victory. Wars are not won by evacuations.”

#একটি বিতর্কিত তত্ত্ব:
কিছু কথা না বললেই নয়। আসলে ‘হল্ট অর্ডার’ নিয়ে অনেক গুজব আছে। যেখানে নাৎসি বাহিনী প্রায় মিত্রবাহিনীকে শেষ করে দিচ্ছিল। সেখানে হিটলারের এই আচমকা সিদ্ধান্ত কেন?
নিচে কয়েকটি কারণ দেয়া হলো:

➡অনেকে বলেন এটা নাকি হিটলারের একটা খেয়ালি সিদ্ধান্ত ছিল।মানে নিজ শিকারকে খাঁচায় পুড়ে একটু ইতরামো করা।ব্যাপারটা টম এন্ড জেরির হিটলার ভার্শন বা মিলিটারি ভার্শন বলতে পারেন।

➡অনেক ইতিহাসবিদের মতে, হিটলার তার এই আদেশের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, যেকোন ক্ষেত্রেই,যেকোন মুহূর্তে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

➡আবার অনেকে মনে করেন, হিটলার এদের আটক করে চেয়েছিলেন আলোচনায় বসতে। এক কথায় ব্রিটেনকে নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করার ছোট প্রয়াস।

➡অন্য এক মতবাদে বলা হয়েছে, হিটলার ভয়ে ছিল।তিনি ভেবেছেন এটা একটা ফাঁদ।যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশ যেকোনো সময় তাদের মিত্র ব্রিটেন,ফ্রান্স,বেলজিয়ামকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারে এমন একটি গুজব ছিল।
তাই তিনি মিশন স্থগিত করেন।

তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাটল অফ ডানকার্কে যদি জার্মান বাহিনী জয়লাভ করতো কিংবা মিত্রশক্তি আত্মসমর্পণ করে ফেলতো তাহলে হিটলারের ইউরোপ জয় এক প্রকার সুনিশ্চিতই ছিলো।ইতালি ও জার্মানি মিলে এককথায় রাজত্ব করতো পুরো ইউরোপে।হিটলারের সেই ‘হল্ট অর্ডার’ই হয়ে দাঁড়ালো হিটলারের জন্য কাল।অথচ তিনি ভয়াবহ বিমান হামলা করে কিংবা দুর্ধর্ষ জার্মান বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে ৪ লাখ সৈনিকের বেশিরভাগই মেরে ফেলতে/আত্মসমর্পণ করাতে পারতেন।একসাথে এত বিপুল পরিমাণ সৈনিক হারালে মিত্রবাহিনী আর কখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারতো কিনা সন্দেহ।অল্প সময়ে লাখ লাখ যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করা সম্ভব কিন্তু সৈনিক তৈরি করা সম্ভব নয়।

উদ্ধারকৃত সৈনিকদের দল

এখানে আপনি যদি ভাবেন হিটলার দয়া দেখিয়েছেন তাহলে আপনি ভুল করবেন।দয়া দেখানো যুদ্ধের নীতি নয়,তাছাড়া হিটলারও তেমন স্বভাবের মানুষ ছিলেন না।সব মিলিয়ে এটি ছিল হিটলারের একটি ভুল সিদ্ধান্ত।

#মুভি:
ব্যাটল অফ ডানকির্ক নিয়ে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ৭টির মত মুভি বানানো হয়েছে তারমধ্যে ক্রিস্টোফার নোলানের ১০ম মুভি ‘ডানকার্ক’ দর্শক রেটিংয়ে সবচেয়ে সেরা।

মুভির শুটিংয়ে নোলান

নোলানের বাকি ৯টি মুভির একটিও যদি না দেখে থাকেন তাহলে উপরে লেখা উনার বক্তব্যের অর্থ বুঝবেন না।অন্য পরিচালক মুভি বানান আর তিনি সন্তানের মত মুভি #জন্ম দেন।সাধারণত আমরা অভিনেতা-অভিনেত্রী কে সেটা দেখে তারপর মুভি দেখি।কিন্তু নোলান সেইসব হাতে গোনা কয়েকজন পরিচালকের একজন যার নাম শুনলেই মানুষ মুভি দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে।

ফলোইং, দ্যা প্রেস্টিজ,ব্যাটম্যান ডার্ক নাইট ট্রিলজি, ইনসেপশোন এর মতো সিনেমা বানানোর পরেও সমালোচকরা যখন বলেন ‘ডানকির্ক’ সম্ভবত নোলানের সেরা সিনেমা তখন এই মুভিটা অবশ্যই দেখা উচিৎ।আপনি যদি আগে থেকে war মুভি দেখে অভ্যস্ত হন তাহলে জাস্ট টাসকি খাবেন।কারণ war মুভি মানেই গোলাগুলি, রক্তারক্তি আর ভায়োলেন্স।কিন্তু নোলানের প্রথম war মুভি ৮/১০টি war মুভি থেকে একদমই ভিন্ন।এজন্য যারা চলচ্চিত্রবোদ্ধা,সিনেমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যারা বিশ্লেষণ করেন তাদের কাছে এই মুভিটা এককথায় মাস্টারপিস।আর যারা জাস্ট ‘কথা কম,গোলাগুলি বেশি’ এই টাইপের মারদাঙ্গা war মুভি পছন্দ করেন তাদের কাছে এই মুভি একদমই ফালতু এবং ওভাররেটেড।উনার আগের মুভিগুলা দেখলে বুঝতে পারবেন কেন এরকম নতুন,অপ্রচলিত ধারার war ক্যাটাগরির মুভি বানিয়ে নোলান সফল হলেন।

ডানকির্ক অভিনয় করেছেন-ফিয়ন হোয়াইটহেড,টম গ্লিন-কার্নি,জ্যাক লোওডেন,হ্যারি স্টাইলস,অ্যানিউরিন বার্নার্ড,জেমস ডি-আর্সি,ব্যারি কিওঘান,মার্ক রাইল্যান্স,টম হার্ডি,সিলিয়ান মার্ফি,কেনেথ ব্রানাঘ প্রমুখ অভিনেতা।ডিরেকশন-মেকিং-চিত্রনাট্য-সিনেমাটোগ্রাফি-ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক-ভিজুয়াল ইফেক্টস ২০১৭ এর অন্যতম সেরা মুভি ডানকার্ক!
ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের জন্য হ্যান্স জিমারকে রীতিমত কুর্নিশ।লিজেন্ডারি লেভেলের কাজ।সিনেমাটোগ্রাফি এবং এডিটিং এ যথাক্রমে হইতে ভ্যান হইতেমা এবং লি স্মিথ জাস্ট কাঁপিয়ে দিয়েছেন।আর নোলান বসের তুলনা তো সে নিজেই।অভিনয়ের ক্ষেত্রেও সবাই ফাটিয়ে দিয়েছে,সকলে দুর্দান্ত।তবুও সকল সেরাদের মধ্য থেকেও সবথেকে সেরা করেছেন ব্যারি কিওঘান,টম গ্লিন-কার্নি,অ্যানেউরিন বার্নার্ড,টম হার্ডি এবং সিলিয়ান মার্ফি।আর ওয়ান ডিরেকশন ব্যান্ডের সদস্য হ্যারি স্টাইলকে দেখে মনেই হয়নি এটা তার প্রথম মুভি! ব্রিটিশ এয়ার ফোর্সের সদস্যরূপে টম হার্ডি এবং সৈন্যদের বাঁচাতে আসা বোটমালিকের ছেলেরূপে টম গ্লিন-কার্নির ক্যারেক্টার সবথেকে ভালো লেগেছে।এই সিনেমায় ত্যাগের দৃষ্টান্ত হিসেবে চিত্রনাট্যকে এক অন্যরকম সার্থকতা দিয়েছে টম হার্ডির ক্যারেক্টারটি।

তবে একটা ব্যাপার বলতেই হয়, ডানকার্ক মুভিটি কিন্তু গতানুগতিক যুদ্ধের সিনেমা নয়, বরং যুদ্ধের ময়দানে একজন সৈনিক কী অনুভব করতে পারে সে অনুভূতি দর্শকদের দেবার জন্য এক ফিল্ম। কোনো চরিত্রের ব্যাকস্টোরি এখানে দেয়া হয়নি, শুধু সে মুহূর্তে তাঁরা কতটা আতঙ্কে আছেন সেটাই এ মুভির উপজীব্য।নোলান একবারের জন্যও জার্মান সৈনিককে দেখাননি কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন শত্রু জার্মানরা তিনদিকে ঘিরে ধরলে একজন মানুষ কেমন আতংক অনুভব করে সেটি যেন দর্শক অনুভব করতে পারে।তথাকথিত যুদ্ধের সিনেমার মতো তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ফাইটিং সিন নেই এই সিনেমায়,তবুও যুদ্ধের সিনেমাগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা হয়ে থাকবে এটি।

যুদ্ধের মুভিতে কম্পিউটার গ্রাফিক্স থাকবে না, তা কি হয়? কিন্তু নোলান তো এমনিতেই পছন্দ করেন না গ্রাফিক্সের ব্যবহার। তিনি চান সত্যিকারের জিনিস ব্যবহার করা হোক। এখানেও তাই হয়েছে। চার লাখ সেনা কীভাবে দেখাবেন নোলান? প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৫০০ এক্সট্রা লোক এই মুভিতে তিনি ব্যবহার করেন, আর বাকি কাজ চালান কার্ডবোর্ডের সেনা বানিয়ে। মুভিটিতে সত্যিকারের ৬২টি জাহাজ ব্যবহৃত হয়! এর মধ্যে ১২টি সেই ১৯৪০ সালের ডানকার্কে ব্যবহৃত সত্যিকারের নৌযান!

ডানকার্ক ছবির টাইটেল তিনটি রঙ দিয়ে লেখা। আকাশী নীল, গারো নীল আর কমলা- যার মানে আকাশ, সাগর আর ভূমি। এই তিন জায়গা থেকেই মুভির কাহিনী এগিয়ে যায়। নোলান ইচ্ছে করেই অপরিচিত আর নতুন অভিনেতাদের দিয়ে অভিনয় করিয়েছেন, যাদের বয়স ডানকার্কের সেনাদের বয়সের কাছাকাছি। হ্যারি স্টাইলসকে কেন নোলান বাছাই করলেন- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি হ্যারি স্টাইলসকে হিথ লেজারের ডার্ক নাইটে জোকার হিসেবে বেছে নেয়ার সাথে তুলনা করে চমকে দেন! তবে হ্যারি স্টাইলস এখানে থাকবার কারণে নারী ভক্তের সংখ্যা বেশি বেড়ে গিয়েছিল শুটিং স্পটে, তাই তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষী রাখা হয়েছিল। মজার ব্যাপার, এই মুভিতে কোনো নারী অভিনেত্রী ছিলেন না বলবার মতো। পুরো মুভি জুড়েই কেবল পুরুষ!

ক্রিস্টোফার নোলান আর তাঁর স্ত্রী এমা থমাস ইংল্যান্ড থেকে ডানকার্ক নৌকাতে করে যান আবহটা পাবার জন্য। এতে তাদের লেগেছিল ১৯ ঘণ্টা! মুভির লন্ডন প্রিমিয়ারে ডানকার্কে বেঁচে যাওয়া ৩০ জন আমন্ত্রিত ছিলেন। তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কেমন লেগেছে মুভিটি। তাঁরা বলেছিলেন, মুভিটি নিখুঁতভাবে সেই ডানকার্কের ঘটনা তুলে ধরতে পেরেছে।মুভি ইতিহাসে আগে কোনো মুভিতে এতগুলো নৌযান ব্যবহৃত হয়নি।যেখানে ডানকার্কের ঘটনা ঘটেছিল সেই জায়গাতেই এই মুভির শুটিং করেছেন ক্রিস্টোফার নোলান।কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা বিষয়টি হলো,এই মুভিটিতে মিত্রবাহিনীর সেনাদেরকে ঘিরে ফেলেছিল জার্মান সেনারা,অথচ পুরো মুভি জুড়ে একবারও কোনো জার্মান সেনাকে দেখানো হয়নি! এক ঝলক চোখে পড়লেও দেখা যায়নি কোনো চেহারা। নোলান চেয়েছিলেন মুভিটিতে দর্শক কেবল আতঙ্কটা অনুভব করুক!!

প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আর সিনেমাটোগ্রাফির মিশেলে মনে হচ্ছিলো যেন এক দুর্দান্ত সাসপেন্স মুভি দেখছি,গায়ে শিহরণ কাজ করেছে প্রায় প্রতিটি মুহূর্তে।এই সিনেমা হলে গিয়ে না দেখার আফসোস আমার অনেকদিন থাকবে!
তবে আমার মতো যারা হলে দেখতে পারেননি,তাদের বলবো হাই কোয়ালিটির হেডফোন লাগিয়ে দেখবেন। এখনো অদেখা থেকে থাকলে, এখুনি দেখে ফেলুন আইএমডিবি-তে 8.7 রেটিং পাওয়া এ মুভিটি। তাছাড়াও রটেন টম্যাটোসে ৯৩% ও মেটাক্রিটিকে ৯৪% স্কোর ডানকার্কের! কিন্তু এতে আসলে অবাক হবার কিছু নেই, ক্রিস্টোফার নোলান যে ছবির পরিচালক ও লেখক আর ডানকার্ক যে ছবির গল্প, সে ছবি কি সফল না হয়ে পারে?

বি:দ্র: লেখাটির কিছু অংশ বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহিত ও সম্পাদিত,বাকিটা আমার দ্বারা সংযোজিত।ধৈর্য্য ধরে পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: