১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর ছিল ভারতের দুঃখ ভুলার দিন।১৯৬৫ সালে পাকিস্তান নৌবাহিনীর হাতে ব্যাপক মার খাওয়ার পর দুর্বলতার কারণে সামান্যতম জবাব ও দিতে পারে নি ভারত।সেই দুঃখ ভুলতে পারে নি তারা।তাই যুদ্ধের পরপরই ভারতীয় নৌবাহিনীতে ডিফেন্স বাজেট বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়।ব্যাপক সংস্কার এর অংশ হিসেবে ইন্ডিয়ান নেভিতে যোগ হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন এর ৮টি Osa II class ফাস্ট এট্যাক ক্রাফট।এগুলো ভারতীয় নেভিতে বিদ্যুৎ ক্লাস মিসাইল বোট হিসেবে যোগ হয়।(আরেক জায়গায় দেখলাম chamak ক্লাস।আসল নাম কোনটা সেটাই বুঝলাম না) ফুল লোডেড অবস্থায় এগুলো ছিল ২৪৫ টন ওজন এর।১২৭ ফিট দৈর্ঘ্যের এই FAC গুলোতে অস্ত্র হিসেবে ছিলো ৪টি SS-N-2 A Styx এন্টি শিপ মিসাইল।এছাড়া ২টি ৩০ মিলিমিটার এর একে-২৩০ গান ছিল।ফাস্ট এট্যাক ক্রাফট এর সবচেয়ে ভাইটাল ফ্যাক্টর হলো তার গতি।ইন্ডিয়ান নেভির গর্ব এই মিসাইল বোট গুলোর গতি ছিল ৩৭ নট!
মানে প্রায় ৭০ কিলোমিটার পর আওয়ার! এবার আসল ঘটনায় যাই অপারেশন ট্রাইডেন্ট।

অপারেশন ট্রাইডেন্ট

১৯৭১ সাল।বাংলাদেশ-পাকিস্তান যুদ্ধ চলছে।
ডিসেম্বরে পাকিস্তান ভারতকে সরাসরি এট্যাক করে।এতে ভারত পাকিস্তানের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

আগেই বলেছিলাম,ভারতীয়রা দ্বারকাতে খাওয়া মার এর কষ্ট তখনও ভুলতে পারে নাই।বাংলাদেশ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের কল্যানে তারা প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ পেয়ে যায়।পাকিস্তান নেভির ইজ্জত লুণ্ঠনের এই চটকদার আইডিয়াটি মাথায় আনেন তৎকালীন এডমিরাল সর্দারীলাল মাথুরদাস নন্দা।ভারতীয় নৌবাহিনী পুরো করাচী বন্দরকে বিচ্ছিন্ন করার প্ল্যান করে।প্ল্যান মাফিক ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১সালে, তিনটি বিদ্যুৎ ক্লাস মিসাইল বোট- নিপাত,নির্ঘাত এবং বীর পাকিস্তানের দিকে যায়।
(মিসাইল বোটের কি বাহারি নাম রে বাবা!)
সেইসঙ্গে এদের এসকর্ট করার জন্য ছিল দুটি আর্নালা ক্লাস এন্টি সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার করভেট এবং একটি অয়েল ট্যাংকার।প্রসঙ্গত বলি পাকিস্তানি দুর্ধর্ষ সাবমেরিন গাজীর ভয়ে ভারতীয় নেভি ভীত ছিল।এজন্যই এন্টি-সাবমেরিন করভেট দুটোকে এসকর্ট এর কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিল।

সাবমেরিন গাজীর বিস্তারিত পড়ুন এই লিঙ্কে

পাকিস্থানের দিকে অগ্রসর হয় এই বাহিনী। করাচী বন্দর থেকে ৪৬০ কিলোমিটার দূরে এই ফ্লিট পৌঁছে যায় সন্ধ্যার আগেই এবং সেখানে দাঁড়িয়ে পরে।এত দূরে নোঙর করার কারণ ছিল, যাতে পাকিস্তান এয়ারফোর্সের নাগালের বাইরে থাকা যায় এবং তারা রাতের অপেক্ষা করছিল। অপারেশনটা রাতে করার মূল কারণ ছিল,রাতে স্ট্রাইক করার মত কোনও বিমান তখন পাকিস্তানের কাছে ছিল না। তাই ভারতীয় ফ্লিটকে লক্ষ্য করে এয়ার অ্যাটাকের কোনও ভয় ছিল না।তারপর রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে, নিপাত,নির্ঘাত আর বীর পাকিস্তানের করাচী বন্দরের দিকে এগোতে থাকে। আলাদা আলাদা পথে প্ল্যান মাফিক। তিনটি বোটেই চারটি করে অ্যান্টিশিপ মিসাইল SS-N-2 ছিল। প্রথম শিকারটি করে আইএনএস নির্ঘাত, করাচী হতে ১৩০ কিলোমিটার দূরে সে পেয়ে যায় তার প্রথম শিকার পাকিস্তান নেভির ডেসট্রয়ার পিএনএস খাইবার।এই ডেস্ট্রায়ার খাইবার অপারেশন দ্বারকাতে দাদাদের একদম খেয়ে দিয়েছিল।
তারপর একটি SS-N-2 খাইবারের দিকে ছুটে যায় আইএনএস নির্ঘাত থেকে।জাহাজের রাডারে মিসাইলকে ভুল করে বিমান বলে ধরে নেওয়া হয়।ভুলটা বুঝতে পারার পর খাইবারের ক্রুরা বোফোর্স অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান দিয়ে মিসাইল নামাতে যায়।তারপর যা হওয়ার তাই হল।প্রচণ্ড বিস্ফোরণে তলিয়ে গেল পাকিস্তান নেভির ডেস্ট্রয়ার।

মিসাইল ফায়ারিং

এরপরের শিকারটি করে আইএনএস নিপাত।
করাচী বন্দর থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরে তার টার্গেট ছিল সে পেয়ে যায় বেসামরিক জাহাজ ভেনাস এবং ডেস্ট্রয়ার শাহজাহান।
এই শাহজাহান সাহেব ও ভালোই বাঁশ দিয়েছিল ইন্ডিয়াকে।ভারতীয় গোয়েন্দাদের খবর ছিল, ভেনাসে করে প্রচুর পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র পূর্ব পাকিস্তানে যাচ্ছে এবং এটিকে এসকর্ট করছে পিএনএস শাহজাহান।তবে শেষ রক্ষা আর হল না।আইএনএস নিপাতের রাডারে ধরা পড়ে যায় ওই দুই জাহাজ। আর সঙ্গে দুটি SS-N-2 ছুটে যায় দুই জাহাজ লক্ষ্য করে। ভেনাসে অ্যান্টি-শিপ মিসাইল লাগার সঙ্গে সঙ্গে সেটি ডুবতে শুরু করে। অন্য মিসাইলটি শাহজাহানে হিট করে।তবে সেটি ডোবেনি,মারাত্মক ভাবে আঘাত পাওয়াতে সেটি পাল্টা জবাব দেয়ার ক্ষমতা হারায়।ফলে ক্যাপ্টেন বাধ্য হয়েই পালিয়ে যান।
(যুদ্ধ করার ক্ষমতা না থাকলে অযথা শত্রুর হাতে মরার দরকার কি..?)
পরবর্তী তে পিএনএস শাহজাহানকে স্ক্র্যাপ করা হয়।এর পরের টার্গেটে আঘাত হানে আইএনএস বীর।পাকিস্তানি মাইন-সুইপার মুহাফিজকে হিট করে একটা SS-N-2 এন্টি শিপ মিসাইল।

পিএনএস শাহজাহান

অন্যদিকে, করাচী বন্দরের যে বিশাল অয়েল ট্যাংকার ছিল,সেটিতে একটি মিসাইল মারা হলে পুরো বন্দরে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে।এই অপারেশনের মাধ্যমেই দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে প্রথম অ্যান্টিশিপ মিসাইলের সফল প্রয়োগ হয়।পাকিস্তানি বন্দর ও জাহাজ গুলি ধ্বংসের পর প্রায় ১০০ জনের ওপর পাকিস্তানি নাবিক মারা যায়।ভারতীয় মিসাইল বোট এর ফ্লিট অপারেশন শেষে নিরাপদে ভারতীয় সীমায় পৌঁছে যায়।

প্রসঙ্গত আরেকটা কথা বলি।
১৯৬৭ সালের ৬দিনের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে এই Soviet Osa II class (মানে ভারতের বিদ্যুৎ ক্লাস) মিসরের নৌবাহিনীর ছিল।যুদ্ধে সেটি দিয়ে মিসর,ইসরাইল নেভির ফ্রিগেট ইলিয়টকে ডুবিয়ে দেয়।১৯৬৫ দ্বারকাতে আক্রান্ত হওয়ার পর ভারতীয়রা তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র জারজল্যান্ড ইসরাইলকে আক্রান্ত হতে দেখে ১৯৬৭ তে।Soviet Osa II class ফাস্ট এট্যাক ক্রাফট এর কার্যকারীতায় মুগ্ধ হয়ে ইন্ডিয়া ৮ টা বোট কিনে,যা ১৯৭১ এ (আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কিছুদিন আগে) সার্ভিস এ আসে।এগুলো দিয়েই পরবর্তীতে অপারেশন ট্রাইডেন্ট এ (উপরের কাহিনী) পাকিস্তানকে খেলে দেয়া হয়।উল্লেখ্য এরকম ৫টা মিসাইল বোট আমাদের নেভিতেও ছিল যা বর্তমানে ডিকমিশন করা হয়েছে।

এবার আরেকটা মজার কাহিনী বলি….
৬৭ এর আরব-ইসরাইল যুদ্ধের কিছু পরে(১৯৬৮ তে) সোভিয়েত ইউনিয়ন Osa II class ফাস্ট এট্যাক ক্রাফট পাকিস্তানকে অফার করে,কিন্তু তারা তা রিজেক্ট করেছিল

এরপর, বাকিটা ইতিহাস 😂

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: